সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বাংলাদেশের তরুণ ও দক্ষ পেশাজীবীদের মধ্যে রিমোট ওয়ার্কের জনপ্রিয়তা দ্রুত বেড়েছে। বিশ্বের বিভিন্ন দেশের কোম্পানি এখন বাংলাদেশের কর্মীদের বিপিও, ফ্রিল্যান্সিং ও চুক্তিভিত্তিক সেবা প্রদানের মাধ্যমে রিমোটভাবে কাজের সুযোগ দিচ্ছে। এসব কাজের মাধ্যমে অনেকেই বিদেশি মুদ্রায় আয় করছেন এবং তা আনুষ্ঠানিক ব্যাংকিং চ্যানেলের মাধ্যমে দেশে পাঠাচ্ছেন। এ কারণে একটি সাধারণ ভুল ধারণা তৈরি হয়েছে, বিদেশ থেকে টাকা এলে তা রেমিট্যান্স এবং তাই করমুক্ত। কিন্তু বাস্তবে আয়কর আইন ২০২৩ এ এই আয়ের করযোগ্যতা সম্পর্কে আরও সুস্পষ্ট নির্দেশনা রয়েছে। আইন অনুযায়ী রিমোট কাজ বা বিপিও থেকে প্রাপ্ত আয় করমুক্ত হবে কি না, তা প্রধানত নির্ভর করে ব্যক্তির কর-নিবাসী অবস্থান এবং আয়ের উৎস কোথায়, তার ওপর।
মূল প্রশ্নটি অন্যত্র, কারা রেসিডেন্ট করদাতা? আইনের ধারা ২৬–এ স্পষ্ট বলা হয়েছে, যিনি ‘রেসিডেন্ট’ বা নিবাসী হিসেবে বিবেচিত, তিনি দেশে বা বিদেশে যেখানেই আয় করুন না কেন, তার সব আয় করের আওতায় আসবে। ধারা ২(৪৫) অনুযায়ী, কোনো ব্যক্তি যদি করবর্ষে অন্তত ১৮৩ দিন বাংলাদেশে অবস্থান করেন, অথবা ৯০ দিনের সঙ্গে আগের চার বছরে মোট ৩৬৫ দিন থাকেন, তাহলে তিনি রেসিডেন্ট করদাতা। অর্থাৎ যারা দেশে বসে বিদেশি প্রতিষ্ঠানের জন্য রিমোট কাজ করছেন, তাদের অধিকাংশই এই সংজ্ঞা অনুযায়ী রেসিডেন্ট করদাতা, এবং তাদের বৈশ্বিক আয় করযোগ্য।
এখন প্রশ্ন, যখন আয়টি বিদেশ থেকে আসে, তখন কি সেটি বিদেশি উৎসের আয় হিসেবে বিবেচিত হতে পারে? কর নির্ধারণে ‘আয়ের উৎস’ একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন। ধারা ২৭–এ বলা হয়েছে, যে আয় বাংলাদেশে ‘উপার্জিত, উপচিত বা উদ্ভূত’ বলে গণ্য হবে, সেই আয় করযোগ্য। আপনি দেশে বসে যদি বিদেশি প্রতিষ্ঠানে সেবা দেন, তবে সেই সেবার বিনিময়ে যে অর্থ পান, তা বিদেশ থেকে রেমিট্যান্স হিসেবে এলেও বাংলাদেশের উৎস হতে অর্জিত আয় হিসেবে বিবেচিত হবে। সুতরাং এটি স্বয়ংক্রিয়ভাবে করমুক্ত নয়। আরও উল্লেখ আছে, বাংলাদেশে সম্পাদিত চাকরি বা সেবা, বাংলাদেশে অবস্থিত স্থাপনা বা সম্পত্তি থেকে অর্জিত আয়, সরকার বা নিবাসীর প্রদত্ত ফি, সুদ, রয়্যালটি, কারিগরি সেবা ইত্যাদি সবই বাংলাদেশের উৎসের আয় হিসেবে ধরা হবে।
তবে আইন কিছু বিশেষ ক্ষেত্রে করমুক্ত সুবিধা প্রদান করে। আয়কর অধ্যাদেশের ষষ্ঠ তফসিলের প্রথম অংশের ধারা ১৭–তে উল্লেখ আছে, বাংলাদেশের কোনো স্বাভাবিক করদাতা বিদেশে আয় উপার্জন করলে এবং সেই আয় ব্যাংকিং চ্যানেলের মাধ্যমে দেশে আনয়ন করলে, সে আয় মোট আয়ের হিসাব থেকে বাদ যাবে, অর্থাৎ করমুক্ত হবে। কিন্তু এই সুবিধা কেবল করদাতা বিদেশে গিয়ে কাজ করে আয় উপার্জন করেন, সে আয় দেশে ব্যাংকিং চ্যানেলে আনলে করমুক্ত হবে; দেশে বসে রিমোট কাজ করে বিদেশি আয় করলে তা এ সুবিধার আওতায় আসে না, কারণ তারা নন-রেসিডেন্ট হিসেবে গণ্য হন না। ফলে যারা দেশে থেকেই বিদেশি প্রতিষ্ঠানে কাজ করছেন, তারা এই করমুক্ত সুবিধা পাবেন না।
Leave a Reply