প্রথম বাংলা ২৪ ডেস্কঃ ইয়েমেনের হুতি বিদ্রোহীদের ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলায় সৌদি আরবে নিরাপত্তা পরিস্থিতির অবনতি হয়েছে। রাজধানী রিয়াদের কিং খালিদ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে হামলা ও ধারাবাহিক নিরাপত্তা হুমকির কারণে বিমান চলাচল ব্যাহত হচ্ছে। এর প্রভাব পড়েছে বাংলাদেশের আকাশপথেও। গত শনিবার থেকে মঙ্গলবার রাত পর্যন্ত ঢাকার হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর থেকে পরিচালিত সরাসরি ও ট্রানজিট রুটের ৮২টি ফ্লাইট বাতিল বা স্থগিত হয়েছে। এতে ভোগান্তিতে পড়েছেন ১৩ হাজার ৭১ জন যাত্রী।
মঙ্গলবার (১৩ অক্টোবর) রাতে বিমানবন্দর কর্তৃপক্ষের দেওয়া তথ্যের বরাতে এ খবর জানিয়েছে বিভিন্ন সংবাদমাধ্যম। একই দিনে বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্স জানায়, যাত্রীদের নিরাপত্তার কথা বিবেচনায় ঢাকা থেকে সৌদি আরবের রিয়াদ ও দাম্মামগামী সব ফ্লাইট আগামী ১৭ অক্টোবর পর্যন্ত স্থগিত থাকবে। জরুরি প্রয়োজনে যাত্রীদের জেদ্দা ও মদিনা বিমানবন্দর ব্যবহার করার পরামর্শ দিয়েছে সংস্থাটি।
সৌদি আরবে কর্মস্থলে যোগ দিতে দেশের বিভিন্ন জেলা থেকে ঢাকায় আসা যাত্রীরা ফ্লাইট বাতিলের খবর পেয়ে বিপাকে পড়ছেন। তাঁদের অনেকের ভিসার মেয়াদ শেষ হওয়ার পথে, আবার কারও নির্ধারিত সময়ে কাজে যোগ দেওয়ার বাধ্যবাধকতা রয়েছে।
গণমাধ্যমের এক সাক্ষাৎকারে জানা যায়, চাঁপাইনবাবগঞ্জ থেকে আসা সৌদিপ্রবাসী মো. মাহিরুল জানান, দুই মাসের ছুটিতে দেশে ফেরার সময়ই ফিরতি টিকিট করেছিলেন। গত রোববার ঢাকা থেকে রিয়াদ যাওয়ার কথা ছিল তাঁর। বিমানবন্দরে এসে ফ্লাইট বন্ধের খবর জানতে পারেন।
তিনি বলেন, আগে থেকে ফ্লাইট বাতিলের খবর জানতে পারলে এই ভোগান্তিতে পড়তে হতো না। পরে ঢাকা থেকে দুবাই হয়ে আল কাসিম যাওয়ার জন্য অন্য একটি এয়ারলাইন্সের টিকিট কেটেছেন। ভিসার মেয়াদ প্রায় শেষ হওয়ায় সময়মতো কর্মস্থলে পৌঁছানো নিয়ে দুশ্চিন্তায় রয়েছেন তিনি।
বিমানবন্দর কর্তৃপক্ষের তথ্য অনুযায়ী, বাতিল বা স্থগিত হওয়া সরাসরি ফ্লাইটের মধ্যে বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের ১০টি, ইউএস-বাংলা এয়ারলাইন্সের ১০টি, সৌদিয়ার পাঁচটি এবং রিয়াদ এয়ারের সাতটি রয়েছে।
এ ছাড়া ট্রানজিট রুটে ইন্ডিগোর ২২টি, সালামএয়ারের চারটি, ইজিপ্টএয়ারের একটি, এমিরেটসের ১১টি, কাতার এয়ারওয়েজের ছয়টি এবং ফ্লাইদুবাইয়ের ছয়টি ফ্লাইট বাতিল বা স্থগিত হয়েছে।
ফ্লাইট বাতিল, বিলম্ব কিংবা সময়সূচি পরিবর্তনের কারণে ক্ষতিগ্রস্ত যাত্রীদের প্রয়োজনীয় সহায়তা নিশ্চিত করতে সংশ্লিষ্ট এয়ারলাইন্সগুলোকে নির্দেশনা দিয়েছে বিমানবন্দর কর্তৃপক্ষ। গত সোমবার রাতে বিমানবন্দরের নির্বাহী পরিচালক গ্রুপ ক্যাপ্টেন এস এম রাগীব সামাদ স্বাক্ষরিত চিঠিতে এসএমএস, ফোনকলসহ বিভিন্ন মাধ্যমে যাত্রীদের সময়সূচির পরিবর্তন ও ফ্লাইট বাতিলের তথ্য জানানোর নির্দেশ দেওয়া হয়।
ইয়েমেনের হুতি-নিয়ন্ত্রিত রাজধানী সানায় বিশেষ সামরিক অভিযান চালানোর ঘোষণা দিয়েছে সৌদি নেতৃত্বাধীন জোট। জোটের মুখপাত্র মেজর জেনারেল তুর্কি আল-মালিকি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে একটি মানচিত্র প্রকাশ করে সংশ্লিষ্ট এলাকার বেসামরিক নাগরিকদের দ্রুত সরে যাওয়ার আহ্বান জানান।
প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, সানার উপকণ্ঠে ইয়েমেন পেট্রোলিয়াম কোম্পানির আল-সাবাহা সেন্ট্রাল স্টেশনকে সম্ভাব্য লক্ষ্যবস্তু হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। এর জবাবে হুতিদের সামরিক মুখপাত্র ইয়াহিয়া সারিয়া হুঁশিয়ারি দিয়েছেন, সানায় হামলা চালানো হলে রিয়াদে কঠোর পাল্টা জবাব দেওয়া হবে।
এদিকে, সৌদি কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, রিয়াদের উত্তরাঞ্চল লক্ষ্য করে আসা তিনটি ড্রোন আকাশেই ধ্বংস করা হয়েছে। অন্যদিকে হুতিরা দাবি করেছে, তারা রিয়াদের পাশাপাশি দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলীয় শহর খামিস মুশাইতের একটি বিমানঘাঁটিতেও ড্রোন হামলা চালিয়েছে।
ক্রমাগত হামলার মধ্যে সৌদি যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমানের নিরাপত্তা নিয়েও উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। দ্য ওয়াল স্ট্রিট জার্নাল-এর এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, নিরাপত্তা হুমকির কারণে যুবরাজকে কঠোর নিরাপত্তাবেষ্টিত বিভিন্ন প্রাসাদে সরিয়ে নেওয়া হচ্ছে।
ধারাবাহিক হামলার পর সৌদি আরবের কিং খালিদ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের কার্যক্রম ১৭ অক্টোবর পর্যন্ত বন্ধ রাখার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। বিমান চলাচল স্থগিত থাকায় আন্তর্জাতিক এয়ারলাইন্সগুলোও তাদের ফ্লাইট বাতিল, স্থগিত কিংবা বিকল্প পথে পরিচালনা করছে। এর ফলে মধ্যপ্রাচ্য হয়ে চলাচলকারী আন্তর্জাতিক যাত্রীদের ভ্রমণেও বিঘ্ন ঘটছে।
সৌদি আরবের নিরাপত্তা পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগের মধ্যে দেশটির আকাশ প্রতিরক্ষা সক্ষমতা নিয়েও আলোচনা চলছে। দেশটির বিশাল ভূখণ্ডজুড়ে বিমানবন্দর, তেল স্থাপনা ও গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো সুরক্ষিত রাখা বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠেছে বলে বিশ্লেষকেরা মনে করছেন।
রিয়াদে ধারাবাহিক হামলার পর সাধারণ মানুষের নিরাপত্তা, আগাম সতর্কবার্তা এবং জরুরি পরিস্থিতিতে কর্তৃপক্ষের প্রস্তুতি নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। বিমানবন্দর বন্ধ, ফ্লাইট স্থগিত এবং বিভিন্ন এলাকায় নিরাপত্তাব্যবস্থা জোরদার করার কারণে বাসিন্দা ও ভ্রমণকারীদের মধ্যে উদ্বেগ বেড়েছে।
আঞ্চলিক সংঘাতের প্রেক্ষাপটে সৌদি আরব ও ইয়েমেনের হুতিদের মধ্যে উত্তেজনা নতুন করে বেড়েছে। ২০১৫ সালে ইয়েমেনের গৃহযুদ্ধে সৌদি নেতৃত্বাধীন জোট হস্তক্ষেপ করার পর দুই পক্ষের সংঘাত তীব্র হয়। ২০২২ সালে যুদ্ধবিরতির উদ্যোগ নেওয়া হলেও সাম্প্রতিক আঞ্চলিক উত্তেজনা ও পাল্টাপাল্টি হামলায় পরিস্থিতি আবারও অস্থিতিশীল হয়ে উঠেছে।
সৌদি আরবের বিমানবন্দরগুলোতে নিরাপত্তা পরিস্থিতি স্বাভাবিক না হওয়া পর্যন্ত আন্তর্জাতিক ফ্লাইট চলাচলে অনিশ্চয়তা থাকতে পারে। তাই সৌদি আরবগামী যাত্রীদের বিমানবন্দরের উদ্দেশে রওনা হওয়ার আগে সংশ্লিষ্ট এয়ারলাইন্সের সঙ্গে যোগাযোগ করে ফ্লাইটের সর্বশেষ অবস্থা নিশ্চিত হওয়ার পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে।
Leave a Reply