ডেস্ক রিপোর্ট | প্রথম বাংলা ২৪
নেত্রকোনার দুর্গাপুরে অনুসন্ধানী সাংবাদিক লুৎফুজ্জামান আলিফ ফকিরকে (৪০) গুলি করে হত্যার ঘটনায় সীমান্ত এলাকার অপরাধচক্রের সম্পৃক্ততা নিয়ে সন্দেহের কথা উঠে এসেছে। স্থানীয় সাংবাদিক ও এলাকাবাসীর দাবি, মাদক কারবার, চোরাচালান এবং অবৈধ বালু-পাথর উত্তোলন নিয়ে প্রতিবেদন প্রকাশের কারণে বিভিন্ন অপরাধী চক্রের বিরাগভাজন হয়েছিলেন তিনি। তবে হত্যাকাণ্ডের প্রকৃত কারণ ও এর পেছনে কারা জড়িত, তা তদন্তের মাধ্যমে নিশ্চিত হওয়া যাবে।
নিহত আলিফ ফকির ‘রূপসী বাংলা টেলিভিশন’-এর দুর্গাপুর প্রতিনিধি হিসেবে দায়িত্ব পালন করতেন। পাশাপাশি তিনি অনুসন্ধানী সাংবাদিকতায় যুক্ত ছিলেন। দুর্গাপুরের তেলুঞ্জিয়া এলাকায় শ্বশুরবাড়িতে থেকে সাংবাদিকতা করতেন তিনি। পরিবারে স্ত্রী, চার বছর বয়সী এক কন্যা ও দেড় বছর বয়সী এক পুত্রসন্তান রয়েছে।
ছদ্মবেশে তথ্য সংগ্রহ, অপরাধী চক্রের ক্ষোভের অভিযোগ
স্থানীয় সাংবাদিক ও এলাকাবাসীর ভাষ্য অনুযায়ী, সীমান্ত এলাকার বিভিন্ন অপরাধের তথ্য সংগ্রহে ব্যতিক্রমী কৌশল অবলম্বন করতেন আলিফ। কখনো মুচি, ফেরিওয়ালা কিংবা মানসিক ভারসাম্যহীন ব্যক্তির ছদ্মবেশে এলাকায় ঘুরে তথ্য সংগ্রহ করতেন বলে দাবি করেছেন তারা।
আলিফের পরিচালিত ‘ডিটেকটিভ আর্টিকেল’ (Detective Article) নামের ফেসবুক পেজে সীমান্ত এলাকার বিভিন্ন অপরাধ নিয়ে ভিডিও ও তথ্য প্রকাশ করা হতো। এসব প্রতিবেদন প্রকাশের কারণে সংশ্লিষ্ট অপরাধী চক্রের সঙ্গে তার বিরোধ তৈরি হয়েছিল বলে স্থানীয়দের অভিযোগ। তবে এসব অভিযোগের সঙ্গে হত্যাকাণ্ডের যোগসূত্র তদন্তে যাচাই করা প্রয়োজন।
হত্যার আগের দিন অপরাধচক্রের তথ্য প্রকাশের ঘোষণা
তদন্তসংশ্লিষ্ট একটি সূত্রের বরাতে জানা গেছে, হত্যাকাণ্ডের আগের দিন, ১৫ অক্টোবর, আলিফ তার ফেসবুক পেজে সীমান্ত এলাকার একটি অপরাধচক্রের বিষয়ে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য প্রকাশের ঘোষণা দিয়েছিলেন বলে দাবি করা হচ্ছে। ওই ঘোষণার সঙ্গে হত্যাকাণ্ডের কোনো সম্পর্ক রয়েছে কি না, তা এখনো নিশ্চিত নয়।
একই দিন রাত ৮টার দিকে দুর্গাপুরের তেলাঞ্জিয়া এলাকার একটি চায়ের দোকানে বসে থাকা অবস্থায় তাকে লক্ষ্য করে গুলি চালানো হয়। এতে ঘটনাস্থলেই বা পরে তার মৃত্যু হয় কি না, সে বিষয়ে সুনির্দিষ্ট তথ্য প্রয়োজন। ময়নাতদন্তের প্রতিবেদনে তার শরীরে ছয়টি গুলির আঘাত পাওয়ার কথা উল্লেখ রয়েছে বলে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে। এর মধ্যে একটি গুলি তার পিঠে আটকে ছিল বলে জানা গেছে।
আগেও হামলার শিকার হয়েছিলেন আলিফ
স্থানীয় সূত্রগুলোর দাবি, এর আগেও আলিফের ওপর হামলার ঘটনা ঘটেছিল। ২০২৫ সালের জানুয়ারি ও নভেম্বর মাসে ধারালো অস্ত্র নিয়ে তার ওপর হামলা চালানো হয়েছিল বলে অভিযোগ রয়েছে।
এ ছাড়া মৃত্যুর প্রায় এক বছর আগে একটি প্রকাশ্য পুলিশি সভায় আলিফ নিজের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছিলেন বলে স্থানীয় সাংবাদিকদের দাবি। ওই সভায় ৯ এমএম পিস্তলধারী একটি দল তাকে হত্যার উদ্দেশ্যে ওত পেতে থাকত বলেও তিনি অভিযোগ করেছিলেন বলে জানা গেছে।
তার নিরাপত্তা নিয়ে আগে কোনো লিখিত অভিযোগ বা আনুষ্ঠানিক আবেদন করা হয়েছিল কি না এবং সে বিষয়ে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী কী ব্যবস্থা নিয়েছিল, তা সংশ্লিষ্ট নথি ও কর্তৃপক্ষের বক্তব্যের মাধ্যমে যাচাই করা প্রয়োজন।
হত্যা মামলা, একজন গ্রেপ্তার
হত্যাকাণ্ডের পরদিন, ১৬ অক্টোবর, আলিফের স্ত্রী আনন্দিতা সাংমা বাদী হয়ে দুর্গাপুর থানায় অজ্ঞাতনামা সাত থেকে আটজনকে আসামি করে হত্যা মামলা করেন বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
এ ঘটনায় অপূর্ব নামের ২২ বছর বয়সী এক তরুণকে সন্দেহভাজন হিসেবে গ্রেপ্তার করে রিমান্ডে নেওয়া হয়েছে বলে জানা গেছে। তবে মামলায় তার সুনির্দিষ্ট ভূমিকা কী, সে বিষয়ে তদন্তের ফলাফল প্রকাশের আগে কোনো সিদ্ধান্তে পৌঁছানো সমীচীন নয়।
পুলিশ আলিফের ব্যবহৃত মুঠোফোন, কল রেকর্ড এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের কথোপকথনসহ বিভিন্ন তথ্য-উপাত্ত বিশ্লেষণ করছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি। হত্যাকাণ্ডের পরিকল্পনাকারী ও জড়িত অন্য ব্যক্তিদের শনাক্ত করতে তদন্ত চলছে।
এদিকে সাংবাদিক আলিফ ফকির হত্যার সুষ্ঠু তদন্ত, জড়িত ব্যক্তিদের শনাক্তকরণ এবং দোষীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানিয়েছেন সাংবাদিকদের বিভিন্ন সংগঠন ও সংশ্লিষ্ট মহল।
প্রথম বাংলা ২৪-এর পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে, একজন অনুসন্ধানী সাংবাদিক হত্যার ঘটনায় প্রকৃত কারণ উদ্ঘাটন, সব অভিযোগ নিরপেক্ষভাবে যাচাই এবং দোষীদের আইনের আওতায় আনা জরুরি। একই সঙ্গে সাংবাদিকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কার্যকর পদক্ষেপ প্রয়োজন।
Leave a Reply